বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১২:৪০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
কালীগঞ্জে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছেলের পরীক্ষায় নাম্বার কম দেওয়ায় শিক্ষিকাকে নির্যাতন পরিবেশ রক্ষায় কালিগঞ্জে ফলজ, বনজ ও ভেষজ চারা বিতরণ কর্মসূচি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা আনোয়ার ইব্রাহিমের কক্ষ নম্বর ৫০১ এবং নেতৃত্বের নৈতিক সংকট পবিত্র আশুরা নিয়ে ডিএমপির নির্দেশনা ফটিকছড়ির ইমন ঢাকায় গ্রেপ্তার — ‘বড় সাজ্জাদ’ বাহিনীর অন্যতম শীর্ষ সহযোগী দাবি পুলিশের গাজীপুরে তিতাস-জেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযান: অবৈধ গ্যাস ব্যবহারে দুই কারখানাকে ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা জরিমানা তারেক রহমানের সঙ্গে আনোয়ার ইব্রাহিমের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ‘রাজনৈতিক সৌজন্যের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ: সুজন অবশেষে শাশুড়িকে ডিভোর্স দিলেন জামাই

কক্ষ নম্বর ৫০১ এবং নেতৃত্বের নৈতিক সংকট

  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬
  • ১০ ভিজিটর
ফারজানা আক্তার।
ফারজানা আক্তার : রাজনীতিতে নেতার সক্ষমতা কেবল তার বাগ্মিতায় নয়, বরং তার সিদ্ধান্ত ও আচরণের স্বচ্ছতায় প্রতিফলিত হয়। একটি সাধারণ রাজনৈতিক মানদণ্ড হলো – নেতার গায়ে আঁচ লাগার আগে যদি কর্মীর গায়ে আঁচ লাগে, তবে তিনি রক্ষক হিসেবে ব্যর্থ। আবার, যদি কর্মীর ত্যাগের বিনিময়ে নেতা নিজের নিরাপত্তা বা ভোগবিলাসে মগ্ন থাকেন, তবে তিনি একজন আদর্শিক অভিভাবক হিসেবেও দেউলিয়া।
বর্তমানে কাগজে – কলমে হাজারো নেতা পাওয়া যায়, তবে সংকটের মুহূর্তে নৈতিক মেরুদণ্ড ধরে রাখা নেতৃত্বের বড্ড অভাব। এই সংকটের একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হলেন – মাওলানা মামুনুল হক। জনসম্মুখে তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং একটি আদর্শের প্রতিনিধি – যিনি ধর্ম ও রাজনীতির সংমিশ্রণে নিজেকে একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে বসিয়েছেন।
গুলিস্তানের আক্কাসের ব্যক্তিগত জীবন রাষ্ট্রীয় পরিসরে আলোচনার দাবি রাখে না; কিন্তু যখন কেউ হাজারো অনুসারীর জীবন ও বিশ্বাসের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন, তখন তার ব্যক্তিগত জীবন আর কেবল ‘ব্যক্তিগত’ থাকে না, তা হয়ে ওঠে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবক। হয় তা অনুসারীদের সঠিক পথে পরিচালিত করে, অথবা তাদের চরম বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দেয়। বিশেষ করে, মোদিবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে অসংখ্য মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও সাধারণ কর্মী রাজপথে নেমেছিল। তাদের আবেগ ও অন্ধ আনুগত্যকে পুঁজি করে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তার পরিণাম ছিল মর্মান্তিক। অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন, অনেক পরিবার আপনজন হারিয়েছেন। অথচ, সেই শহীদদের রক্তের দাগ না শুকাতেই যখন একই নেতাকে প্রথম স্ত্রীকে মিথ্যে বলে তথাকথিত দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে রিসোর্টে দেখা যায়, তখন তা কেবল নৈতিক স্খলন নয়, বরং অনুসারীদের ত্যাগের প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞাও বটে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সক্ষমতা এবং প্রয়োজন হলে পুরুষ একাধিক বিয়ে করতে পারবে৷ তবে শর্তও আছে। কিন্তু মামুনুল হকের ঘটনায় গোপনে বা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সম্পর্কের যে ব্যাখ্যা সামনে এসেছে, তা ধর্মের মৌলিক শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক। রোজার প্রকৃত শিক্ষা যেমন কেবল অভুক্ত থাকা নয়, বরং প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও সংযম অনুশীলন করা, তেমনি একজন নেতার জীবনও হতে হয় আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত। যিনি রাষ্ট্র পরিচালনার উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখেন, তাকে ব্যক্তিগত কাম-বাসনার ঊর্ধ্বে উঠে জবাবদিহিতার উদাহরণ তৈরি করতে হয়। ব্যক্তিগত জীবনের এই অসংলগ্নতা কেবল তার ধর্মীয় পরিচয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং অনুসারীদের আদর্শিক দিকভ্রান্তিকেও ত্বরান্বিত করে। সুতরাং, যিনি নিজেকে একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আদর্শের অগ্রদূত হিসেবে দাবি করেন, যার অবয়ব ও আচরণ দেখে সাধারণ মানুষ কোনো দর্শনকে বোঝার চেষ্টা করে, এবং যিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বসার আকাঙ্ক্ষা রাখেন, তার জীবন থেকে সমাজ সর্বোচ্চ ত্যাগ ও আত্মসংযম প্রত্যাশা করে।
নিজের কাম, বাসনা ও প্রবৃত্তির ওপর যার নিয়ন্ত্রণ নেই, যিনি সাময়িক আত্মসুখের জন্য সম্পর্কের স্বচ্ছতা ও সততাকে বিসর্জন দিতে পারেন, তিনি আর যাই হোন, কোনো আদর্শিক আন্দোলনের পথপ্রদর্শক হতে পারেন না। নেতার আদর্শিক উচ্চতার সাথে এই ধরণের চারিত্রিক বৈপরীত্য কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কয়েকদিন আগেই পড়লাম জর্জ অরওয়েলের কালজয়ী রাজনৈতিক রূপক উপন্যাস এনিমেল ফার্ম। এই উপন্যাসের মূল মেসেজটা বর্তমান সংকটের সাথে বেশ মিলে যায়। অরওয়েল দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি আদর্শিক বিপ্লবের পর নেতৃত্বের আসনে বসা চরিত্রগুলো ধীরে ধীরে তাদের জনসম্মুখের বক্তব্য এবং ব্যক্তিগত আচরণের মধ্যে এক বিশাল প্রাচীর গড়ে তোলে। এনিমেল ফার্ম-এর তাত্ত্বিক মূলনীতি ছিল সকলের সমতা এবং ত্যাগের মহিমা। কিন্তু ক্ষমতা সুসংহত হওয়ার পর নেতারা অনুসারীদের জন্য কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং সংযমের বিধান জারি করলেও, নিজেদের জন্য সুযোগ-সুবিধা এবং ব্যক্তিগত বিলাসের নতুন নতুন অজুহাত তৈরি করতে শুরু করে।
সাধারণ অনুসারীরা যখন আদর্শের বেদীতে নিজেদের জীবন ও শ্রম উৎসর্গ করছিল, নেতারা তখন পেছনের দরজা দিয়ে সেই ত্যাগের ফসল নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে ও আত্মসুখে ব্যবহার করতে ব্যস্ত ছিল। এই যে জনসম্মুখে ত্যাগের বাণী প্রচার করা এবং অন্তরালে নিজের প্রবৃত্তি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করা – এই দ্বৈত নৈতিকতাই হলো অরওয়েলীয় দর্শনের মূল সংকট।
বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও আমরা যখন দেখি, নেতার ডাকে সাধারণ কর্মীরা জীবন বাজি রাখছে, আর নেতা নিজের ব্যক্তিগত জীবনে সেই ত্যাগের আদর্শ ধারণ না করে সুবিধাবাদী ও অসচ্ছ আচরণ করছেন৷ নেতৃত্ব কোনো সুযোগ বা প্রিভিলেজ নয়, এটি একটি গুরুভার ও আত্মত্যাগের মহোত্তম স্মারক। যে নেতা কর্মীদের রক্তে ভেজা রাজপথের আর্তনাদকে গুরুত্ব না দিয়ে – নিজের কাম-বাসনার টানে প্রথম বউকে লুকিয়ে দ্বিতীয় বউ নিয়ে রিসোর্টে যায় – তিনি আসলে অনুসারীদের বিশ্বাসের সাথে প্রতারণা করেন।
সমাজকে পরিবর্তন করার পূর্বে নেতাকে নিজের প্রবৃত্তির ওপর বিজয় লাভ করতে হয়। জননেতা হতে হলে জনসম্মুখের সততা আর ঘরের ভেতরের সততার মধ্যে কোনো দূরত্ব থাকতে নেই।
যতদিন পর্যন্ত আমাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতিতে এই জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতার পাহারাদারী প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন পর্যন্ত নেতৃত্ব কেবলই এক প্রকার চাতুর্য আর ক্ষমতার অপব্যবহারের হাতিয়ার হিসেবেই থেকে যাবে।
লেখক পরিচিতি: কলামিস্ট ও সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টি, কেন্দ্রীয় কমিটি।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

Comments are closed.

এই বিভাগের আরও খবর