বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬, ১২:২০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ঈদুল আযহা উপলক্ষে কালীগঞ্জে অসহায়দের মাঝে নগদ অর্থ বিতরণ পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের গরু খাওয়া বন্ধ এটা কতটা রাজনৈতিক, আর কতটা অমানবিক? আদ-দ্বীন হাসপাতালের সেই ওয়ার্ড দ্রুতই সিলগালার ঘোষণা যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় আজ ঈদুল আজহা, নেই কোরবানি, নেই আনন্দ কালিগঞ্জে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে মাননীয় এমপি মহোদয়ের ঈদ উপহার বিতরণ কালীগঞ্জ বাইক রাইডার্সের উদ্বোধন ও অফিসিয়াল টি-শার্ট লঞ্চ অনুষ্ঠিত মুনশুরপুর মদিনাতুল মুনাওয়ারা মাদ্রাসা’র উদ্যেগে ইসলামি সংস্কৃতিক ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান কালীগঞ্জে কিশোরী ধর্ষণ: পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার ঈদে নিরাপত্তা ও মহাসড়ক তদারকিতে কঠোর অবস্থানে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গাজীপুরে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের গরু খাওয়া বন্ধ এটা কতটা রাজনৈতিক, আর কতটা অমানবিক?

  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬
  • ৫৮ ভিজিটর

ফারজানা আক্তার:  আপনি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাধীন নাগরিক। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি রাষ্ট্রবিরোধী কিছু না করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি কী খাবেন, কী পরবেন, কী করবেন এই ব্যাপারে কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারে না। কিন্তু “রাষ্ট্র স্বাধীন, নাগরিক স্বাধীন” এই কথাগুলো এখন যেন শুধু খাতা-কলমেই শোভা পাচ্ছে। বাস্তবতা বলছে অন্য কথা।

বলছিলাম পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের কথা। তাদের রাষ্ট্রনেতারাই ঠিক করে দিচ্ছেন তারা গরু খাবে নাকি খাবে না। কুরবানির ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোর একটি। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুসলমানরা এই দিনে পশু কুরবানি দিয়ে থাকে। রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব হলো, তার রাষ্ট্রে যে যে ধর্মের মানুষ বসবাস করে, তাদের সবাই যেন নিজ নিজ ধর্ম, দর্শন ও বিশ্বাস স্বাধীনভাবে পালন করতে পারে সেটা নিশ্চিত করা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা কী পেল?

কয়েকদিন আগেই সেখানে নির্বাচন হলো। নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেস বা বাম দলগুলো বড় বড় বয়ান দিলেন-মুসলমানরা গরু খাওয়ার স্বাধীনতা পাবে। একদিকে ভোট শেষ, অন্যদিকে সেই বয়ানও বন্ধ হয়ে গেল।

একটি উদাহরণ দিই। কেউ এসে আপনাকে বললো, “আপনি আর ইলিশ মাছ খেতে পারবেন না।” আপনি কারণ জানতে চাইলেন। কারণ ইলিশ খাওয়া তো হারাম নয়, কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কাজও নয়। তখন বলা হলো, “অন্য কোথাও কিছু মানুষ মনে করেন ইলিশ খাওয়া ঠিক না। এতে তাদের এলার্জি হয়। ” তখন আপনার কেমন লাগবে? রাগ লাগবে? অবাক লাগবে? নাকি মনে হবে এটা আপনার ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ?

কারণ যার ইলিশে এলার্জি আছে, সে খাবে না। আপনার নেই আপনি তো খেতে পারেন।

ঠিক এই অনুভূতিটাই বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ লক্ষ মুসলমানের। তাদের গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে একের পর এক বাধা, চাপ এবং রাজনৈতিক টানাটানি তৈরি হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান জনসংখ্যা প্রায় ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় অনুশাসনের সঙ্গে গরুর মাংস ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কুরবানির ঈদে গরু জবাই ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাছাড়া দৈনন্দিন জীবনেও গরুর মাংস অনেক মুসলিম পরিবারের কাছে একটি সাশ্রয়ী ও পুষ্টিকর খাবার।

কিন্তু গত কয়েক বছরে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গরুর মাংস নিয়ে বিতর্কও বাড়ছে। কখনো ট্রেনে গরুর মাংস বহন করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে, কখনো পাড়ায় গরু জবাই করা নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে, আবার কখনো রাজনৈতিক দলগুলো এই ইস্যুকে ভোটের হাতিয়ার বানাচ্ছে।

গরু নিয়ে বিতর্ক ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন নয়। কিন্তু নতুন বিষয় হলো এই বিতর্ককে ক্রমশ “হিন্দু বনাম মুসলিম” ফ্রেমে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আর এই ফ্রেমিং থেকে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চলছে দুই দিক থেকেই।

একদিকে বিজেপির মতো দলগুলো “গো-রক্ষা” কে হিন্দু আবেগের সঙ্গে যুক্ত করে একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক মজবুত করতে চাইছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস বা বাম দলগুলো মুসলিম ভোটারদের “বিপদ থেকে রক্ষাকারী” হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে চাইছে। মাঝখানে পড়ে থাকছেন সাধারণ মানুষ-যারা শুধু নিজের পছন্দের খাবার খেতে চান, শান্তিতে বাঁচতে চান।

রাজনীতিবিদরা জানেন, মানুষের খাবার আর ধর্ম এই দুটি বিষয় সবচেয়ে দ্রুত আবেগকে উসকে দেয়। তাই এই ইস্যুগুলোকে বারবার জিইয়ে রাখা হয়, কারণ এগুলো “ভোট-উপযোগী”।

এই তো গেল রাজনীতির কথা। এবার আসি বাস্তবতায়।
পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম বা মফস্বলে যে মুসলিম পরিবারগুলো বাস করে, তাদের মাসিক আয় হয়তো ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। সেই পরিবারে গরুর মাংস শুধু একটি খাবার নয় এটা একটি সাশ্রয়ী প্রোটিনের উৎস। মুরগির দাম যখন আকাশছোঁয়া, খাসির মাংস যখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, তখন গরুর মাংসই অনেক পরিবারের কাছে একমাত্র বিকল্প।

এখন যদি সামাজিক চাপ, আইনি জটিলতা বা গো-রক্ষকদের ভয়ে সেই পরিবার গরুর মাংস কিনতে না পারে, তাহলে তাদের সন্তানের পাতে কী পড়বে? এই প্রশ্নটা শুধু ধর্মের নয় এটা মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারেরও প্রশ্ন।

তার ওপর আছে মর্যাদার প্রশ্ন। একজন মানুষ যখন বাজার থেকে মাংস কিনে বাড়ি ফিরছেন, আর পথে কেউ তাকে থামিয়ে “কী মাংস?” জিজ্ঞেস করছে সেই মুহূর্তে তার যে অপমান হচ্ছে, সেটাকে কোন আইনে মাপবেন?

রাষ্ট্র তো তাকে রক্ষা করার কথা ছিল। কিন্তু রাষ্ট্র যদি নীরব থাকে, কিংবা পরোক্ষভাবে এই সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেয়, তাহলে সেটাকে কি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা বলবেন, নাকি এক পক্ষকে সুবিধা দেওয়া?

ভারতের সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত পছন্দের অধিকার দিয়েছে। খাবার বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাও সেই অধিকারেরই একটি অংশ। পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংস খাওয়া বা বিক্রি করা আইনত নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু “আইনত বৈধ” আর “সামাজিকভাবে নিরাপদ” এই দুটি বিষয় এখন আর একই জায়গায় নেই।

যখন কোনো মানুষ আইনি অধিকার থাকা সত্ত্বেও সামাজিক ভয়ে, গো-রক্ষকদের ভয়ে কিংবা রাজনৈতিক উত্তেজনার ভয়ে তার অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন না, তখন বুঝতে হবে সেই সমাজে নীরবে অনেক কিছুর পচন ধরেছে।

এখন হয়তো অনেকে বলবেন, ভারতে হিন্দুদের সংখ্যা বেশি। গরু তাদের কাছে পবিত্র প্রাণী। সেটিও অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের অনুভূতিও সত্যি এবং সম্মানযোগ্য। কিন্তু অনুভূতি আর জোরজবরদস্তি – এই দুটো এক বিষয় নয়। এই বিষয়টা মাথায় রাখা জরুরি।

আপনি গরুকে পবিত্র মানতেই পারেন। কিন্তু আপনার প্রতিবেশী কী খাবেন, সেটা জোর করে ঠিক করে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। একটি সুস্থ সমাজে বৈচিত্র্যের মধ্যে সহাবস্থানই স্বাভাবিক। বাংলার ইতিহাসও তো সেটাই বলে। হিন্দু-মুসলিম পাশাপাশি বসে হাজার বছর কাটিয়েছেন। তাহলে এই আধুনিক যুগে এসে এমন কী ঘটলো যে এই সম্প্রীতি এত ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে?

কারণ রাজনীতি। কারণ ভোটের হিসাব। কারণ কিছু মানুষের কাছে বিভাজনটাই লাভজনক।

আধুনিকতার নামে মানুষ ধীরে ধীরে অমানবিক হয়ে উঠছে। সামনে এর পরিণতি কী হতে পারে?

যদি রাজনৈতিক মেরুকরণ এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে একদিন খাবারের টেবিলও “হিন্দু টেবিল” আর “মুসলিম টেবিল”-এ ভাগ হয়ে যাবে। পাড়ার বাজারে উত্তেজনা বাড়বে। সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস আরও গভীর হবে। আর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে পশ্চিমবঙ্গের সেই অসাম্প্রদায়িক পরিচয়ের, যেটা এই রাজ্যের গর্ব।

তবে আশার আলোও আছে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ঐতিহাসিকভাবে সংস্কৃতি ও যুক্তিকে ধর্মীয় রাজনীতির উপরে স্থান দিয়েছেন। নাগরিক সমাজ, সংবাদমাধ্যম এবং সচেতন তরুণরা যদি এই বিভাজনের বিরুদ্ধেদ্ধ দাঁড়ান, তাহলে রাজনীতির এই খেলা একসময় ব্যর্থ হবেই।

সবশেষে, মানুষের খাবারের পাতে কী থাকবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ভোটব্যাংকের রাজনীতির নয়। এই সিদ্ধান্ত একান্তই ব্যক্তির, পরিবারের এবং তার বিশ্বাসের। রাষ্ট্রের কাজ সেই স্বাধীনতা রক্ষা করা-কেড়ে নেওয়া নয়।

 

লেখক পরিচিতি: কলামিস্ট ও সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টি, কেন্দ্রীয় কমিটি।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

Comments are closed.

এই বিভাগের আরও খবর