ফারজানা আক্তার: ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ সামনে এলো মায়াপাখির একটি ক্লিপ। ক্লিপটা দেখলাম। তারপর কমেন্টবক্সে গেলাম। (এটা আমার অভ্যাস। কমেন্টবক্স দেখি। ভিন্ন ভিন্ন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি জানা যায়।) আর সেখানে যা দেখলাম, সেটাই আমাকে এই লেখাটি লিখতে বাধ্য করল।
হাজারো কমেন্টে একটাই সুর, “এটাই কর্পোরেট জীবনের বাস্তব চিত্র।” অর্থাৎ দর্শকরা বিশ্বাস করে নিলেন যে, কর্পোরেট জগতে যত সফল নারী আছেন, তারা সবাই বসের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে উপরে উঠেছেন। নিজের মেধায়, পরিশ্রমে, যোগ্যতায় কেউ সফল হয়নি। আর কর্মজীবী নারী যারা সংসার করছেন, তারা নাকি আসলে ভেতরে ভেতরে অসুখী!
এখন প্রশ্ন হতে পারে – একটা নাটকের ক্লিপ এত বড় বার্তা দিয়ে দিল? হ্যাঁ, দিল। এবং সেটাই সমস্যা।
ছোট একটা ক্লিপ দেখে মন্তব্য করা ঠিক নয়, তাই বাকিটাও দেখলাম। পরিচালক জাকারিয়া সৌখিন এই নাটকের মাধ্যমে আসলে কী বলতে চেয়েছেন, সেটা তিনিই ভালো জানেন। কিন্তু একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে আমি যা বুঝলাম এবং বাংলাদেশের হাজারো দর্শক যা বুঝলেন – সেটা কমেন্টবক্সে স্পষ্ট।
আমি এখানে কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে বসিনি। আমি লিখছি একজন দর্শক হিসেবে, একজন নারী হিসেবে, একজন কর্মজীবী নারী হিসেবে এবং এমন একজন মানুষ হিসেবে যিনি প্রতিদিন দেখেন – কর্মজীবী নারীরা কতটা অবিশ্বাস আর সন্দেহের মধ্যে দিন কাটান।
নাটকের নায়িকার নাম মায়া। মায়াপাখির “পাখি” সে নিজেই। নাটকে মায়াকে উপস্থাপন করা হয়েছে উচ্চশিক্ষিত, প্রযুক্তি-সচেতন এবং স্বাধীনচেতা একজন নারী হিসেবে। শুনতে ইতিবাচক লাগছে, তাই না? কিন্তু সমস্যাটা এখানেই।
একজন সত্যিকারের উচ্চশিক্ষিত, স্বাধীনচেতা এবং প্রযুক্তি-সচেতন নারীর কখনো বসের সাথে বেড শেয়ার করে উপরে ওঠার প্রয়োজন হয় না। কারণ সে আগে থেকেই যোগ্য। সে জানে নিজের মূল্য। সে নিজের পরিশ্রম আর মেধা দিয়েই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে।
পরিচালক যদি মায়াকে নেগেটিভ চরিত্র হিসেবে দেখাতেই চাইতেন, তাহলে তাকে দাম্ভিক বা অহংকারী দেখাতে পারতেন। কিন্তু না – তিনি বেছে নিলেন সবচেয়ে পুরোনো এবং সবচেয়ে ক্ষতিকর পথটি। বসের সাথে সম্পর্ক।
মায়ার সাফল্যের পর পরিচালক তার মুখ দিয়ে বলান, ” Sumaiy, you are the loser, i am the winner.” এই একটি ডায়লগে মায়াকে দাম্ভিক, অহংকারী এবং সম্পর্কহীন একজন মানুষ হিসেবে তুলে ধরা হলো। এরপর মায়াকে স্বামী এবং সংসার থেকে বের করে বসের সাথে জুড়ে দেওয়া হলো। সমাজকে বার্তাটা দেওয়া হলো একদম সরাসরি – দেখো, কর্মজীবী নারীরা এভাবেই সফল হয়। আর এই সফলতার মূল্য? ভাঙা সংসার, একাকীত্ব আর অসুখী জীবন।
এই বার্তাটা কতটা ভয়ংকর, সেটা হয়তো পরিচালক বুঝতে পারেননি। কিন্তু যে লক্ষ কর্মজীবী নারী প্রতিদিন অফিসে যান এবং ঘরে ফিরেন – তারা বুঝেছেন। তাদের পরিবার বুঝেছে। তাদের স্বামীরা বুঝেছে।
নাটকে দেখানো হয়েছে – যতদিন মায়া কর্পোরেট জগতে ঢোকেনি, ততদিন তার দাম্পত্য জীবন ছিল সুন্দর আর প্রেমময়। কর্পোরেট জগতে পা দেওয়ার পর স্বামীর সাথে দূরত্ব, সংসারের প্রতি উদাসীনতা। কিন্তু বাস্তব ছবিটা কেমন?
বাংলাদেশের একজন সাধারণ কর্মজীবী নারী ভোর পাঁচটায় উঠে রান্না করেন। স্বামীর টিফিন গুছিয়ে দেন। সন্তানকে স্কুলের জন্য তৈরি করেন। তারপর নিজে তৈরি হয়ে ঘর থেকে বের হন – ট্রাফিকের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে অফিসে পৌঁছান। সারাদিন কাজ করেন। সন্ধ্যায় ফিরে আবার রান্নাঘরে যান। এই সংগ্রামটা কোথায় মায়াপাখিতে? এই পরিশ্রমী, ক্লান্ত, তবু হাসিমুখের নারীটার গল্প কেন বলা হলো না? কারণ সেই গল্পে নাটক হয় না? নাকি সেই গল্পে দর্শক টানা যায় না?
নাটকে একটি জায়গায় মায়াকে বলা হয়, “You can use me as a ladder.” এই একটি বাক্যে পুরো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাটা ধরা পড়ে। বলা হচ্ছে – কর্পোরেট জগতে নারীর উত্থান মেধার ভিত্তিতে হয় না, হয় প্রভাবশালী কারো সহায়তায়। এই ধারণাটা বাংলাদেশের অফিসগুলোতে ইতিমধ্যে প্রবলভাবে বিদ্যমান। যখন কোনো নারী প্রমোশন পান, তখন তার পুরুষ সহকর্মীরা অনেক সময় বলেন, “জানোই তো, কীভাবে হয়েছে।” এই বিষবাষ্পটা সমাজে আগে থেকেই ছিল। মায়াপাখি সেই বিষ আরেকটু উসকিয়ে দিল।
নাটকে দেখানো হয় – মায়ার সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে বসের সাথে তার ব্যক্তিগত ছবি দিয়ে বসকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়। মায়ার প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের বিষয়টি আধুনিক ও সচেতন নারীর একটি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে – এটা স্বীকার করতে হবে। কিন্তু এখানে আরেকটি বার্তাও আছে – যুগ যতই আধুনিক হোক, নারী যতই শিক্ষিত আর সফল হোক, তার একটি ছবি বা এডিট করা কন্টেন্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দিলেই সব শেষ। তার উচিত মুখ লুকিয়ে ঘরে বসে থাকা। এটা সচেতনতা নয়। এটা ভয় দেখানো। বার্তা দেওয়া হলো , “বাইরে বেরিও না, বিপদ আছে।”
নাটকে মায়া একসময় বলে, “Professional unhappy.” এই দুটো শব্দ শুনে অনেক কর্মজীবী নারীর বুকে হয়তো চিনচিন করে উঠেছে। কারণ এই অনুভূতিটা সত্যিকারের। ক্যারিয়ার আর সংসারের দ্বিমুখী চাপে পিষ্ট হওয়াটা বাংলাদেশের হাজারো নারীর বাস্তবতা। কিন্তু সমস্যাটা হলো – নাটক এই কষ্টকে দেখাল, কিন্তু কারণটা ভুলভাবে উপস্থাপন করল। মায়ার কষ্টের কারণ হিসেবে দেখানো হলো তার নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর নৈতিক স্খলন। অথচ বাস্তবে কর্মজীবী নারীর কষ্টের কারণ হলো সমাজের দ্বৈত চাপ – অফিসেও পুরোপুরি দিতে হবে, ঘরেও পুরোপুরি দিতে হবে। এই সমীকরণে নারীর নিজের জন্য কোনো জায়গা নেই। সেই সত্যিটা দেখালে হয়তো সমাজ বদলানোর একটা সুযোগ তৈরি হতো। কিন্তু পরিচালক সেই পথে না গিয়ে বেছে নিলেন পুরোনো গল্প।
মায়াপাখি দেখার পর কী হবে? ভাবুন একবার -একজন মেয়ের বাবা ভাববেন, “মেয়েকে কর্পোরেটে পাঠানো কি ঠিক হবে?” একজন স্বামী তার কর্মজীবী স্ত্রীকে সন্দেহের চোখে দেখবেন। একটু সন্দেহ মনে আসবে, যেটা হয়তো আগে ছিল না। একজন পুরুষ সহকর্মী টিটকারি মেরে বলবেন, “দেখেছ? আমি তো আগেই বলেছিলাম।” আর সেই কর্মজীবী নারী, যিনি প্রতিদিন লড়াই করে অফিস করছেন – তিনি আরেকটু একা হয়ে যাবেন। আরেকটু ভয় পাবেন। আরেকটু সংকুচিত হবেন।
অনেকে হয়তো প্রশ্ন করবেন – একটি নাটক এত কিছু করতে পারে? হ্যাঁ, পারে। কারণ গল্প মানুষের মন তৈরি করে। গল্প মানুষের বিশ্বাস গড়ে দেয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি যতটুকু এগিয়েছে, তার পেছনে কর্মজীবী নারীদের অবদান অনস্বীকার্য। গার্মেন্টস থেকে কর্পোরেট অফিস, ব্যাংক থেকে হাসপাতাল – সর্বত্র নারীরা কাজ করছেন। এবং তাদের বেশিরভাগই করছেন দ্বিগুণ পরিশ্রম করে – একদিকে অফিস, অন্যদিকে সংসার।
এই নারীরা চান তাদের মেধাকে সম্মান দেওয়া হোক। তাদের পরিশ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। কিন্তু যখন একটি নাটক তাদের সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তাদের চরিত্রকে কলঙ্কিত করে – তখন সেটা শুধু বিনোদন নয়, সেটা একটি সামাজিক অপরাধ।
ভাবুন একবার – এই নাটকটি দেখে কোনো কিশোরী মেয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে ক্যারিয়ার গড়া তার জন্য নয়। কোনো তরুণী ভাবতে পারে, “সফল হলেই সংসার যাবে, তাহলে আর কী দরকার?” কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে অফিস ছাড়তে চাপ দিতে পারে। আপনার গল্প বলার অধিকার আছে। কিন্তু সেই গল্পের দায়িত্বও আছে। বিশেষ করে যখন সেই গল্প লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখেন এবং সেটাকে সত্য বলে মেনে নেন।
মায়াপাখি হতে পারত অন্যরকম একটা গল্প। মায়া হতে পারত সেই নারী যিনি প্রতিদিন ভোরে উঠে সংসার সামলে অফিসে যান। যিনি সহকর্মীদের সন্দেহের মুখেও মাথা উঁচু করে কাজ করেন। যাকে ব্ল্যাকমেইল করা হয় – কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েন না, লড়াই করেন। যিনি প্রমাণ করেন – মেধা আর পরিশ্রম দিয়েই সফল হওয়া যায়। সেই মায়াকে দেখতে চেয়েছিলাম। সেই মায়া হতে পারত লক্ষ কর্মজীবী নারীর অনুপ্রেরণা। কিন্তু আমরা পেলাম উল্টোটা।
বাংলাদেশের কন্টেন্ট ইন্ডাস্ট্রি দ্রুত বড় হচ্ছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আসছে। দর্শক এখন শুধু টিভির সামনে নয়, ফোনের স্ক্রিনেও নাটক দেখছেন। এই বিস্তৃত ক্যানভাসে গল্প বলার সুযোগ অনেক বেড়েছে। যদি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কর্মজীবী নারীর সত্যিকারের সংগ্রাম, সাহস এবং সাফল্যের গল্প যদি বলা যায় – তাহলে সমাজ বদলাবে। দর্শক বদলাবে। পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে।
কিন্তু যদি মায়াপাখির মতো পুরোনো ধাঁচের গল্প বারবার তৈরি হতে থাকে – তাহলে সেই পরিবর্তন আসতে আরো অনেক দেরি হবে। কর্মজীবী নারীরা আরো বেশি দিন সন্দেহের ছায়ায় বাঁচবেন। তাঁদের আরো বেশি দিন প্রমাণ করতে হবে, “আমি যোগ্য, আমি সৎ, আমি পরিশ্রমী।” এই প্রমাণ করার দায়টা কতদিনে শেষ হবে? সুদিনের অপেক্ষায় আছি। এবং সেই দিন আনতে হলে আমাদের সবাইকে – দর্শক, পরিচালক, লেখক – সবাইকে একটু বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে।
কারণ গল্প শুধু বিনোদন নয়। গল্প সমাজ গড়ে। আর ভালো গল্প – ভালো সমাজ গড়ে।
লেখক পরিচিতি: কলামিস্ট ও সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টি, কেন্দ্রীয় কমিটি।