কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি: দুর্নীতি-অনিয়ম,স্বেচ্ছাচারিতা, নারী কেলেঙ্কারিসহ নানা অভিযোগ নতুন কিছু নয়। তিনি সব সময় থাকেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুুতে। বলছি বাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশীলদার আব্দুল হাই শিকদারের কথা। তিনি নলগাঁও সিকদারবাড়ির মৃত কাদু সিকদারের ছেলে।
আব্দুল হাই সিকদার ১৯৮৯ সালে ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তদবিরের মাধ্যমে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন।
অভিযোগ উঠেছে, বাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দালাল চক্রের মাধ্যমে সেবা প্রদান, ঘুষ বাণিজ্য এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকিতেও ভূমি সহকারী আব্দুল হাই সিকদার চ্যাম্পিয়ন। এর আগেও তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশ হলেও কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেননি কর্তৃপক্ষ।
নারী কেলেঙ্কারি ঘটনায় ২০২৫ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন আব্দুল হাই সিকদার। ঘটনাটি আলোচনায় আসলে তার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ তাকে বরখাস্ত করেন। এরপর কয়েকমাস জেল খেটে বের হন তিনি। কিন্তু বরখাস্ত ছিলেন প্রায় দুই বছর। পরবর্তী তিনি হাইকোর্টে মামলা করে তার বিরুদ্ধে করা বরখাস্তের আদেশ তুলে নিয়ে পুনরায় স্বপদে বাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিস বহাল হন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি সহকারী আব্দুল হাই সিকদারের প্রশ্রয়ে অফিসের কোনো অনুমোদিত কর্মচারী না হয়েও সুমন নামে এক চিহ্নিত দলাল নিয়মিত কম্পিউটার পরিচালনা করে বিভিন্ন ভূমি-সংক্রান্ত কাজ করে থাকেন।
সরকারের রাজস্ব ফাঁকির আভিযোগ : গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়নের বন্দা এলাকার ফজলুর রহমানের ৫৪৭ ও ৫৫২ নং দাগে বাড়ি জমির খাজনা আসে ৬৩ হাজার টাকা। চালাক চতুর ভূমি সহকারী আব্দুল হাই সিকদার ১০ হাজার ঘুস নিয়ে ১৩ হাজার ৪শ ৮০ টাকা হালসন পর্যন্ত খাজনা পরিশোদ করে দেন। এতে সরকার রাজস্ব হারিয়েছে ৪৯ হাজার ৫২০ টাকা।
অপরদিকে দক্ষিন দিঘদিয়া এলাকার মুকুল চন্দ্র মল্লিকের বাড়ির দাগ নং -১১২-১১৩ জামির পরিমান এক একর ৩৭ শতাংশ জমির ৯১ হাজার ৯শত ২০ টাকা খাজনা এলে আব্দুল হাই সিকদার ৫০ হাজার টাকা ঘুস নিয়ে ৯হাজার ৩শত ১৬ টাকা খাজনা পরিশোধের রশিদ ধরিয়ে দেন। যেখানে সরকারের ৮২ হাজার ৬০৪ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন আব্দুল হাই সিকদার।
খুন্দিয়া এলাকার ইয়াকুব আলী ৫৯৫ নং দাগে ৩৫ শতাংশ জমির খাজনা ৭৫ হাজার ২৩৩ টাকা খাজনা আসে। তিনি বাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে খাজনা পরিশোধ করতে গেলে ৯হাজার ৯শত ৮৬ টাকার খাজনার রশিদ কেটে দিয়ে ৬৫ হাজার দুইশত ৪৭ টাকা সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন ভূমি সহকারী আব্দুল হাই সিকদার। এর এসব টাকা লেনদেনের মূলনায়ক দালাল সুমন। তার হাত দিয়েই অফিসের সমস্ত ঘুসের টাকা লেনদেন করেন ভূমি সহকারী আব্দুল হাই সিকদার। এই ঘুসের টাকার একটা সুমনকে দেন তিনি।
সম্প্রতি সরেজমিনে ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, সুমন নামে ওই ব্যক্তি কম্পিউটার নিয়ে বসে বিভিন্ন নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ করছেন। স্থানীয়দের দাবি, তিনি অফিসের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নন। অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী আব্দুল হাই সিকদারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তিনি খারিজ, নামজারি ও খাজনার বিভিন্ন আবেদন সংগ্রহ করে থাকেন।
একাধিক সূত্রের দাবি, খাজনা নির্ধারণে কারসাজির মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব কম দেখিয়ে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো জমির খাজনা তিন লাখ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও সেটি এক লাখ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয় এবং বিনিময়ে ঘুষ হিসেবে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করা হয়। এভাবে সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
এদিকে আব্দুল হাই সিকদারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে খারিজ, নামজারি ও ভূমি-সংক্রান্ত ফাইল জিম্মি করে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, যার সঙ্গে তার বৈধ আয়ের সামঞ্জস্য নেই।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের উত্তর বিলাসপুর সড়কের ভাঙা মসজিদসংলগ্ন এলাকায় প্রায় আট কাঠা জমির ওপর নির্মিত পাঁচতলা একটি বাড়ি, একটি মার্কেট ও একটি টিনশেড বাড়ি রয়েছে তার পরিবারের মালিকানায়। এছাড়া নিজ গ্রাম নলগাঁও নতুনবাজার এলাকায় তিনতলা মার্কেটসহ আরও একাধিক স্থাপনা ও জমি রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিলাসপুর এলাকার বাসিন্দা ও ঠেলাগাড়িচালক জলিল বলেন, “প্রায় ১০ বছর ধরে এখানে থাকি। পাঁচতলা বাড়ি, টিনশেড বাড়ি ও মার্কেটগুলো এলাকায় নায়েব আব্দুল হাই সিকদারের সম্পত্তি হিসেবেই পরিচিত।”
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা,হলে আব্দুল হাই সিকদারের স্ত্রী শিরিন সুলতানা গাজীপুরের বাড়ি ও মার্কেট তাদের বলে স্বীকার করেন। পরে আব্দুল হাই সিকদারও গাজীপুরের পাঁচতলা বাড়ি ও মার্কেট এবং কাপাসিয়ার নতুনবাজার এলাকার মার্কেটগুলোর মালিকানা তাদের বলে জানান।
তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ওঠা অভিযোগ ও বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি এখনও একই পদে বহাল রয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।