নাজিম উদ্দিন, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম): দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও বিশ্বের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীর ভাঙনরোধে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সুন্দরপুর এলাকায় তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে নদী রক্ষার এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাঝেই উঠেছে নদী থেকেই ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ। অভিযোগের তীর স্থানীয় এক সাবেক ইউপি সদস্যের দিকে।
স্থানীয়দের দাবি, উত্তোলিত সেই বালুই আবার কিনে ব্যবহার করা হচ্ছে নদীতীর সংরক্ষণকাজে। দীর্ঘদিন ধরে দিন-রাত বালু উত্তোলন চললেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী হালদা নদীতে বালুমহাল ইজারা, বালু ও মাটি উত্তোলন এবং চর কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু এসব নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ফটিকছড়ি উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে নদীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।
রোববার সকালে সরেজমিনে সুন্দরপুর ইউনিয়নের হাড়িঘাটা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীতীর সংরক্ষণ ও বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্প এলাকার অদূরে হালদা নদীতে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই বালু সরাসরি নদীতীরে ফেলা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন সুন্দরপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য শামশুল আলম, যিনি সিনা মেম্বার নামে পরিচিত।
ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করে সিনা মেম্বার বলেন, “বালু উত্তোলনের জায়গাটি আমার নিজের জায়গা। এখান থেকে বালু উত্তোলনের জন্য আবার কার কাছ থেকে অনুমতি নেব?” এ সময় তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে প্রশ্নও তোলেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, গত কয়েক মাস ধরে প্রকাশ্যে নদী থেকে বালু উত্তোলন হলেও প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। তাঁদের মতে, হালদা নদী রক্ষায় সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, অথচ একই প্রকল্পে নদীর তলদেশের বালু ব্যবহার করা হলে তা আইন ও পরিবেশ—দুই দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে হালদা নদীর তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রিলায়েন্স করপোরেশন ও আমিন অ্যান্ড কোম্পানি। প্রকল্পের আওতায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সিসি ব্লক স্থাপন ও জিও ব্যাগ ফেলা হবে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রিলায়েন্স করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী গিয়াস উদ্দিন বলেন, “কাজটি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় কাজ শুরু করি। আমরা স্থানীয় বাসিন্দা সিনা মেম্বারের কাছ থেকে বালু কিনে নিচ্ছি। তিনি কোথা থেকে বালু দিচ্ছেন, সেটি আমার দেখার বিষয় নয়।”
চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সোহাগ তালুকদার বলেন, “ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত নই।”
বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির চেয়ারম্যান ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, “এটি অত্যন্ত অন্যায় ও আত্মঘাতী একটি কাজ। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।”
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, “হালদা নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”