বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
গাজীপুরে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন অভিযান, ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও টেক্সটাইল খাতে অতিরিক্ত ৫% প্রণোদনার দাবি স্পিনিং শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গাজীপুরে ট্রাক-ইজিবাইক সংঘর্ষে নিহত ৩ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এগোচ্ছেন এমপি ফজলুল হক মিলন কমেছে হজের বিমানভাড়া ঢাকা গ্যাজেট ও যুগান্তরে সংবাদ প্রকাশ : স্কুলের জমি লিজের টাকা ফেরত দিলেন দুই বিএনপি নেতা কালীগঞ্জ সেন্ট্রাল কলেজে নবীনবরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত নাটোর-বগুড়া মহাসড়কে ধস-ফাটল, নির্মাণের মান নিয়ে প্রশ্ন জাতীয় ‘আমার মেয়ের হাতের লেখা এমন নয় : গাজী নজরুলের শাশুড়ি সাগর উত্তাল, সমুদ্রবন্দরে বন্দরে ৩ নম্বর সতর্কতা

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও টেক্সটাইল খাতে অতিরিক্ত ৫% প্রণোদনার দাবি স্পিনিং শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের

  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ ভিজিটর

স্টাফ রিপোর্টার : দেশীয় স্পিনিং ও টেক্সটাইল শিল্প সচল রাখতে ১০–৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন এ খাতের সাধারণ শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং রিসাইকেল ও টেকসই পণ্যের ব্যবহার ও উৎপাদন বাড়াতে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। ‘দেশের সম্পদ রক্ষা করি, স্পিনিং শিল্প সচল রাখি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে স্পিনিং শিল্পের শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন
সালমা গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আজহার আলী। এসময় উপস্থিত ছিলেন মোশারফ গ্রুপের পরিচালক শাহীনুল হক ও স্পিনিং শিল্পের কর্মকর্তা কর্মচারীবৃন্দ।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের স্বল্পচাপ ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে দেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। শিল্পের উৎপাদন সচল রাখা, কর্মসংস্থান সুরক্ষা এবং দেশের রপ্তানি ও অর্থনীতির স্বার্থে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানান।

তারা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির ফলে শিল্পকারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত রেখে শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। একটি কারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার সঙ্গে শুধু উৎপাদন নয়, শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মসংস্থান, তাদের পরিবারের জীবিকা এবং দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা সরাসরি সম্পৃক্ত।

১০–৩০ কাউন্ট সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা : সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের আদেশ নম্বর ৫১/২০২৬/কাস্টমস/৫১৯ অনুযায়ী HS Heading ৫২০৫, ৫২০৬ ও ৫২০৭-এর আওতাধীন ১০–৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রদান এবং প্রকৃত রপ্তানিকারকদের নির্ধারিত শর্তে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে।

বক্তারা এই সিদ্ধান্তকে দেশীয় টেক্সটাইল ও স্পিনিং শিল্পের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের দাবি, বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানির কারণে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনযোগ্য ১০–৩০ কাউন্ট কটন সুতার বাজারে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রতিযোগিতামূলক চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোকে সক্ষমতা কাজে লাগানোর সুযোগ দিতে হবে।

তাদের ভাষ্য, এ সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয় সুতা উৎপাদন বাড়তে পারে, বন্ধ ও আংশিক বন্ধ মিলগুলো পুনরায় চালুর সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের সুযোগ বাড়বে এবং খেলাপি ঋণ কমাতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে বলে তারা মনে করেন।

আমদানি বাড়লেও স্থানীয় সক্ষমতার ব্যবহার নিশ্চিতের দাবি : সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৫৩০টি স্পিনিং মিল রয়েছে। এসব মিলে মোট স্পিন্ডল ক্যাপাসিটি বার্ষিক প্রায় ১৮ দশমিক ২১ মিলিয়ন এবং ইনস্টলড ইয়ার্ন উৎপাদন সক্ষমতা ন্যূনতম ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন কেজি বলে দাবি করা হয়।

বক্তারা জানান, বিভিন্ন কারণে ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়ে ১১৭টি স্পিনিং মিল সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৪১৩টি মিল পূর্ণ বা আংশিকভাবে চালু রয়েছে। চালু থাকা মিলগুলোর শুধু ১০–৩০ কাউন্ট কটন সুতা উৎপাদনের বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন কেজি বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

অন্যদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ASYCUDA-এর তথ্য উদ্ধৃত করে বক্তারা বলেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১০–৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানির পরিমাণ ছিল ২১৬ মিলিয়ন কেজি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪৬০ মিলিয়ন কেজিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ দুই অর্থবছরের ব্যবধানে এ শ্রেণির সুতা আমদানি প্রায় ১১৩ শতাংশ বেড়েছে।

তাদের মতে, আমদানির এ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে দেশে বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়টি জাতীয় শিল্পনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে ব্যাংক গ্যারান্টির পক্ষে শ্রমিক-কর্মচারীরা :
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, প্রকৃত রপ্তানিকারকদের জন্য ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানির ব্যবস্থা রাখা হলে একদিকে যেমন রপ্তানি কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের ঝুঁকিও কমবে।

তাদের দাবি, আমদানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শুল্ক-কর সমপরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টি এবং সংশ্লিষ্ট শর্তপূরণের ব্যবস্থা থাকায় বন্ড সুবিধায় আমদানি করা সুতা স্থানীয় বাজারে অবৈধভাবে বিক্রি বা অপসারণের সুযোগ কমবে। এর ফলে সরকারের রাজস্ব আহরণও বাড়তে পারে।

বক্তারা স্পষ্ট করে বলেন, ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির ব্যবস্থা আমদানি বন্ধের কোনো উদ্যোগ নয়; বরং প্রকৃত রপ্তানিকারকদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা।

রপ্তানি আয় দেশে ফেরানোর ওপর গুরুত্ব : সংবাদ সম্মেলনে বিদেশি মুদ্রার নিরাপত্তার স্বার্থে রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আনার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করার সঙ্গে রপ্তানি আয় প্রত্যাবাসনের শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির পর সংশ্লিষ্ট রপ্তানি আয় দেশে প্রত্যাবাসিত এবং অনুমোদিত ডিলার (AD) ব্যাংক কর্তৃক তা নিশ্চিত হওয়ার পর ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সম্প্রতি প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় দেশে প্রত্যাবাসিত না হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগের। এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে রপ্তানি আয় দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে আর্থিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসন না হওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।

৩২ বিলিয়ন ডলারের শিল্প, কর্মসংস্থান প্রায় ৩০ লাখ : বক্তারা বলেন, প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতের সমস্যা শুধু মিল মালিকদের সমস্যা নয়। এ খাতে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং সরাসরি প্রায় ৩০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। পরোক্ষভাবে প্রায় এক কোটি মানুষ এ খাতের ওপর নির্ভরশীল বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।

তাদের মতে, একটি কারখানা বন্ধ হলে এর প্রভাব শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবিকা ও পরিবারের আয়ের পাশাপাশি ব্যাংকের বিনিয়োগ, সরবরাহকারী, পরিবহন ও অন্যান্য সহযোগী খাতের ওপরও পড়ে। ফলে স্পিনিং ও টেক্সটাইল শিল্প সচল রাখা শুধু একটি শিল্পখাতকে সুরক্ষা দেওয়া নয়; এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ এবং জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতার বিষয়ও জড়িত।

সরকারের কাছে চার দফা দাবি : সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কাছে প্রধানত চারটি দাবি তুলে ধরা হয়।

*প্রথমত*, ১০–৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা এবং প্রকৃত রপ্তানিকারকদের নির্ধারিত শর্তে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির সুযোগসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বহাল রাখার দাবি জানানো হয়।

*দ্বিতীয়ত*, শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় চাপ ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

*তৃতীয়ত*, শিল্প, ব্যাংকিং খাত, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় সমন্বিত Textile-RMG নীতি গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

*চতুর্থত*, রিসাইকেল ও সাসটেইনেবল পণ্যের ব্যবহার ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

বক্তারা বলেন, তারা কোনো অযৌক্তিক সুরক্ষা বা বিশেষ সুবিধা চান না। তারা ন্যায্য প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নীতি, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার এবং প্রকৃত রপ্তানিকারকদের কাঁচামাল আমদানির সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছেন।

তারা আরও বলেন, দেশীয় টেক্সটাইল শিল্প শক্তিশালী হলে দেশের রপ্তানি ভিত্তি, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ শিল্পায়নও শক্তিশালী হবে। গ্যাস সরবরাহের উন্নতি এবং ১০–৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানিতে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে বন্ড সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানান।

সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কাছে এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, তাদের প্রত্যাশা—কারখানার উৎপাদন সচল থাকবে, শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মসংস্থান নিরাপদ হবে, প্রকৃত রপ্তানিকারকদের কার্যক্রম নির্বিঘ্ন থাকবে এবং দেশের রপ্তানি সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

Comments are closed.

এই বিভাগের আরও খবর