মাভাবিপ্রবি (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি: মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (মাভাবিপ্রবি) গবেষণার ধারণা থেকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন Q1 জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের বিভিন্ন কৌশল ও সম্ভাবনা নিয়ে ‘From Research Idea to Q1 Journal Publication’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি বিভাগের সেমিনার কক্ষে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি বিভাগের Sub-project PIN: C-53, ICSETEP-এর উদ্যোগে সেমিনারটির আয়োজন করা হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সম্মানিত সদস্য প্রফেসর ড. মো. আসলাম হোসাইন। এতে সভাপতিত্ব করেন মাভাবিপ্রবির ভাইস-চ্যান্সেলরের দায়িত্বে থাকা প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর মো. আনিছুর রহমান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রফেসর ড. মো. আসলাম হোসাইন বলেন, সিএসই ও আইসিটি বিভাগের গবেষকদের গবেষণায় প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং গবেষণার সুফল দেশের প্রান্তিক কৃষকসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। বর্তমান সরকার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। দেশকে এগিয়ে নিতে তরুণ গবেষকদের আরও বেশি করে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা, আর সেই জ্ঞানকে সমাজ ও বিশ্বের সামনে তুলে ধরার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হচ্ছে মানসম্মত গবেষণা প্রকাশনা। গবেষণা যদি কেবল গবেষণাগার, শ্রেণিকক্ষ বা ব্যক্তিগত নথির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তার প্রকৃত মূল্য ও প্রভাব অনেকাংশেই অনাবিষ্কৃত থেকে যায়। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হলেই তা বৃহত্তর একাডেমিক সমাজ, নীতিনির্ধারক, শিল্পখাত এবং সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়। নতুন জ্ঞান তখন আরও গবেষণা, উদ্ভাবন ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
তাই গবেষণা ও প্রকাশনা একে অপরের পরিপূরক। গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান সৃষ্টি হয় এবং প্রকাশনার মাধ্যমে সেই জ্ঞান বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, যাচাই হয় ও স্বীকৃতি লাভ করে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জার্নালে গবেষণা প্রকাশিত হলে তা শুধু একজন গবেষকের অর্জন নয়, বরং সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সক্ষমতারও প্রতিফলন ঘটায়। নিয়মিত ও উচ্চমানের গবেষণা প্রকাশনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃশ্যমানতা, গ্রহণযোগ্যতা ও একাডেমিক মর্যাদা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক গবেষণা সহযোগিতা, জ্ঞান বিনিময় এবং নতুন গবেষণার সুযোগও সম্প্রসারিত হয়।
তিনি আরও বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয় কতটা জ্ঞান সৃষ্টি করছে, সেই জ্ঞান সমাজ ও দেশের সমস্যার সমাধানে কতটা ভূমিকা রাখছে এবং আন্তর্জাতিক জ্ঞানভাণ্ডারে কতটা অবদান রাখছে, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হচ্ছে গবেষণা প্রকাশনা। তাই গবেষণার ফলাফল শুধু প্রকাশ করাই নয়, তা যেন মানসম্মত, প্রাসঙ্গিক এবং সমাজ ও দেশের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেদিকেও গবেষকদের গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু গবেষণা করলেই হবে না; গবেষণার বিষয় নির্বাচন থেকে শুরু করে গবেষণার পদ্ধতি, ফলাফল বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশ—প্রতিটি ধাপেই গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। Q1 জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের জন্য গবেষকদের নতুন ও সময়োপযোগী গবেষণা ধারণা নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রকাশনার মানদণ্ড সম্পর্কে দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ভাইস-চ্যান্সেলরের দায়িত্বে থাকা প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর মো. আনিছুর রহমান বলেন, নতুন কথা বলতে পারার মানুষের সংখ্যা খুবই কম। গবেষণার জন্য প্রথমে সংশ্লিষ্ট জ্ঞানের মূল ভিত্তি এবং নৈতিকতার জায়গা শক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, “জ্ঞানের মাস্তান সবচেয়ে বড় মাস্তান।”
তিনি আরও বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। একটি বড় ঐতিহাসিক বা ভূতাত্ত্বিক ঘটনার চেয়ে একটি নতুন ধারণা পৃথিবীকে অধিক পাল্টে দিতে পারে। নতুন চিন্তা, জ্ঞান ও গবেষণার মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তিনি বলেন, “মাভাবিপ্রবিকে একটি গবেষণাবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উৎসাহিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও প্রকাশনার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। আজকের সেমিনার গবেষণার ধারণাকে মানসম্মত প্রকাশনায় রূপ দেওয়া এবং তা আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের ক্ষেত্রে শিক্ষক-গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।”
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের এ ধরনের প্রশিক্ষণ ও সেমিনারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের গবেষণা দক্ষতা আরও বৃদ্ধি করার আহ্বান জানান।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মতিউর রহমান, আইসিটি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মনির মোর্শেদ, আইসিটি বিভাগের প্রফেসর ড. সাজ্জাদ ওয়াহিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সেলের পরিচালক প্রফেসর ড. মো. আনোয়ার হোসাইন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ইইই বিভাগের প্রফেসর ড. আবদুল খালেক, যিনি রুয়েটের রিসার্চ সেলের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
সেমিনারের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ICSETEP-এর Sub-project PIN: C-53-এর Co-PI প্রফেসর ড. মোছা. নার্গিস আক্তার। মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন একই প্রকল্পের Principal Investigator (PI) ড. নজরুল ইসলাম।
সেমিনারে গবেষণার উপযোগী ধারণা নির্বাচন, গবেষণার মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের প্রস্তুতি, Q1 জার্নাল নির্বাচন, গবেষণাপত্রের কাঠামো এবং প্রকাশনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়।
বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও গবেষণাপত্র প্রকাশনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উৎকর্ষ, গবেষণার দৃশ্যমানতা এবং আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে অবস্থান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ধরনের সেমিনার শিক্ষক ও শিক্ষার্থী-গবেষকদের গবেষণায় আরও উৎসাহিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে সহায়ক হবে।