স্টাফ রিপোর্টার : শুক্রবারের ভুমিকম্পে গাজীপুরের বিভিন্ন ভবন ও কারখানায় ফাটল দেখা দিয়েছে। ভূমিকম্পের তীব্রতায় মানুষ দ্রুত বিভিন্ন বাসা বাড়ী, কল কারখানা থেকে বাইরে বের হয়ে আসে। এসময় তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে কয়েকশ লোক আহত হয়েছেন। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতাল ক্লিনিকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে । এদের মধ্যে অনেককে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। নাগরিকর সেবার জন্য সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুইটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে ।
সারাদেশের মতো শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৯ মিনিটে গাজীপুরেও অনুভূত হয় শক্তিশালী ভূমিকম্প। কয়েক সেকেন্ডের তীব্র ঝাঁকুনিতে আতঙ্কিত মানুষ ঘরবাড়ি, অফিস, কারখানা থেকে ছুটে রাস্তায় বের হয়ে আসেন।
গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান জানান, জেলায় তাড়াহুড়া করে ভবন থেকে নামতে গিয়ে বিভিন্ন এলাকার কয়েকটি শিল্প কারখানার দুই শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৮৬ জন, প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ছাড়া পেয়েছেন ৯৭ জন। টঙ্গীতে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯০ জন । গুরুতর আহত হওয়ায় ঢাকায় রেফার করা হয়েছে ৪৩ জনকে। এছাড়া শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, কাপাসিয়া ও গাজীপুর সদরের বিভিন্ন হাসপাতালেও চিকিৎসা চলছে।
মহানগরীর টঙ্গীর বিসিক এলাকার ফ্যাশন পালস লিমিটেড কারখানাটি শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কাজ করছিলেন কয়েক হাজার শ্রমিক। ভূমিকম্প শুরু হলে কারখানার মোট নয় তলা ভবনের প্রায় সকল শ্রমিক কারখানা থেকে এক সাথে বেরিয়ে আসতে তাড়াহুড়ো করতে থাকেন। এ সময় কারখানাটির জরুরী নিরাপত্তা গেট বন্ধ থাকায় পদদলিত হয়ে আহত হন অনেকে। পরে আতঙ্ক ও পদদলিত হয়ে আহত হওয়া শ্রমিকদের উদ্ধার করে টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালসহ আশপাশের সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়।
গাজীপুর জেলার শ্রীপুর পৌরসভাধীন কেওয়া পূর্বখণ্ড গ্রামের ডেনিম্যাক কারখানার সাততলা ভবনে কমপক্ষে ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। ভূমিকম্পের সময় ভয়ে হুড়োহুড়ি করে বহুতল ভবন থেকে নিচে নামতে গিয়ে পোশাক কারখানার শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মামুন জানান, গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী ও জেলার শ্রীপুরে ভূমিকম্পের সময়ে আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে তাড়াহুড়ো করে কারখানা থেকে নামতে গিয়ে দুই শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
এছাড়া, মহানগরীর ২৪ নং ওয়ার্ড চাকুলিয়া এলাকায় একটি চারতলা ভবন হেলে পড়েছে। গাজীপুর প্রেসক্লাব ভবনের ছাদ থেকে পলেস্টারা খসে পড়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসক কার্যালয় হিসাবে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ী ভবনে কয়েকস্থানে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে জানা গেছে।
গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম জানান, ভূমিকম্পের পড়ে মোট আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছে ৮২ জন। তাদের মধ্যে ভর্তি ৫৫ জন (নারী ৪৯, পুরুষ ৫, শিশু ১)। সবাই মূলত আতঙ্কে দৌড়াতে গিয়ে পড়ে বা ধাক্কা খেয়ে আহত হয়েছেন বলে তিনি জানান।
সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম চালু: মহানগরীর বিদ্যুৎ, পানি, স্যানিটেশন, ভবনে ফাটলসহ যে কোন জরুরী প্রয়োজন ও অভিযোগে সমাধানের জন্য গাজীপুর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ একটি কনট্রোল রুম চালু করেছে।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী জানান, মহানগরবাসীর সুরক্ষা ও সেবা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ভূমিকম্পের পরপরই নগর ভবনের ২য় তলায় কক্ষ নং–২০১ এ ২৪ ঘণ্টার জন্য কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। কন্ট্রোল রুমের টেলিফোন: ০২-২২২৪৪২৪০৭০ মোবাইল: ০১৭১২৮৩৬৮৭৩, ০১৯১৫৬৭৬৮৩২ ই-মেইল: secretary@gcc.gov.bd। তিনি আরো জানান, নাগরিক সেবা, নিরাপত্তা ও ক্ষয়ক্ষতি যাচাই—সব কার্যক্রম দ্রুততার সঙ্গে চলছে।
এদিকে, ভূমিকম্প পরবর্তী সময়ে জেলাবাসীর তাৎক্ষণিক প্রয়োজন ও সমস্যায় সহযোগিতার জন্য গাজীপুর জেলা প্রশাসন একটি আলাদা কনট্রোল রুম চালু করেছে। গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মুতাচ্ছেম বিল্লাহ জানান, ভূমিকম্প পরবর্তী তথ্য সংগ্রহ ও নাগরিক সেবা প্রদানে জেলা প্রশাসনও নিজের জরুরি কন্ট্রোল রুম চালু করেছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার কক্ষ নং-১০৫ এ কনট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। কনট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেন, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোঃ আওলাদ হোসেন ও উচ্চমান সহকারী সানজিদা কনট্রোল রুমের টেলিফোন: ০২-২২৪৪২৩১৭৬ মোবাইল: ০১৭০০৭১৬৬৭৯, ০১৬২০২৮৪১৬৪ ই-মেইল: drrogazipur@ddm.gov.bd।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোতাছেম বিল্যাহ বলেন, “নাগরিক সেবা, নিরাপত্তা, ক্ষয়ক্ষতি যাচাই—সব প্রক্রিয়া জরুরি গতিতে চলছে। যে কোনো তথ্যের জন্য আমাদের কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করুন।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোঃ ইসরাইল হাওলাদার জানান, মহানগরীর প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি আহত নাগরিকদের হাসপাতালে নেয়ার কাজও পুলিশ করছে।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মোঃ যাবের সাদেক বলেন, জেলায় বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। আতঙ্কে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আঘাত পেয়েছে। সব উপজেলায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলম হোসেন জানান, জেলায় তৈরী পোশাক খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে দ্রুত নামতে গিয়ে কিছু শ্রমিক ভাই বোন আহত হয়েছেন। এছাড়া কয়েকটি ভবনে সামান্য ফাটলসহ কিছু ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। আমরা জরুরি সেবা নিশ্চিতের জন্য সব উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, স্বাস্থ্য বিভাগ একযোগে সমন্বিতভাবে কাজ করছি। সকল প্রাপ্ত তথ্য হালনাগাদ করা হচ্ছে। অন্যান্য বিভাগের সাথে নিয়মিত জানানো হচ্ছে।