শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০১:৪০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় আগ্রহী তুরস্ক ঈদের ছুটি না পেয়ে শ্রমিকের আত্মহত্যা? গাজীপুরের টেক্সটাইল মিলে জাকারিয়ার মৃত্যু ঘিরে দানা বাঁধছে রহস্য কালিগঞ্জের নলতায় জমি বিরোধের জেরে গৃহবধূকে মারধর, শ্লীলতাহানি ও স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ প্রান্তিক গ্রাহকদের ভোগান্তি বিবেচনায় আবাসিকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের বাড়তি দাম প্রত্যাহার সিলেটে ইমন আচার্য্য হত্যার প্রতিবাদে জাতীয় গণমাধ্যম কমিশনের মানববন্ধন, দ্রুত বিচার দাবি আজ বাড়ছে বিদ্যুতের দাম খুলনার সওতুল কুরআন মডেল হিফজ মাদরাসায় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা  কাপাসিয়ায় শিবিরের উদ্যোগে শিশু-কিশোরদের নিয়ে ব্যতিক্রমী আয়োজন কালীগঞ্জে সড়কের পাশ থেকে যুবকের মরদেহ উদ্ধার মায়াপাখি: পরিশ্রমী নারীকে ভিলেন বানানোর গল্প, আর সমাজ সেটাতে তালি দিল!

ঈদের ছুটি না পেয়ে শ্রমিকের আত্মহত্যা? গাজীপুরের টেক্সটাইল মিলে জাকারিয়ার মৃত্যু ঘিরে দানা বাঁধছে রহস্য

  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
  • ১৪ ভিজিটর

স্টাফ রিপোর্টার : আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই ছিল পবিত্র ঈদুল আযহা। গ্রামের বাড়িতে একদিকে ঈদের প্রস্তুতি, অন্যদিকে বড় ভাইয়ের বিয়ের আয়োজন। স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ও ভাইয়ের বিয়ের উৎসবে শামিল হওয়ার স্বপ্ন ছিল ২২ বছর বয়সী তরুণ পোশাকশ্রমিক জাকারিয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। ঈদের আগের রাতেই কারখানার শ্রমিক ব্যারাক থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তার ঝুলন্ত মরদেহ।

গত ৩০ মে (বৃহস্পতিবার) রাত আনুমানিক ১১টার দিকে গাজীপুর সদর উপজেলার বানিয়াচালা এলাকায় অবস্থিত ‘মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড’-এর শ্রমিক ব্যারাকে এই ঘটনা ঘটে। নিহত জাকারিয়া গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলার নিজপাড়া গ্রামের আব্দুস সাত্তারের ছেলে। তিনি ওই কারখানায় কর্মরত ছিলেন এবং শ্রমিক ব্যারাকেরই একটি কক্ষে থাকতেন।

ঘটনার বেশ কিছুদিন পেরিয়ে গেলেও জাকারিয়ার মৃত্যুকে ঘিরে সহকর্মী, স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও আলোচনা থামছে না। অভিযোগ উঠেছে— ছুটি না পাওয়া, কর্মস্থলের মাত্রাতিরিক্ত চাপ এবং মানসিক হতাশাই এই তরুণকে আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।

কারখানার শ্রমিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঈদের সময় দেশের অধিকাংশ শিল্প-কারখানা ছুটি দিলেও মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসের একটি অংশে শ্রমিকদের কাজে রাখা হয়েছিল।

সহকর্মীদের দাবি, ঈদের ছুটির মধ্যেই জাকারিয়ার বড় ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান নির্ধারিত ছিল। পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে এই দ্বিগুণ আনন্দে যোগ দিতে জাকারিয়া কর্তৃপক্ষের কাছে ছুটি চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে ছুটি দেওয়া হয়নি।

শ্রমিকদের আরও অভিযোগ, চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে অনেককেই ছুটি না দিয়ে ঈদকালীন সময়ে কাজ করতে বাধ্য করা হতো। ছুটি না পেয়ে জাকারিয়া মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং এর জের ধরেই তিনি আত্মহননের পথ বেছে নেন বলে ধারণা করছেন তার সহকর্মীরা।

ঘটনার রাতে মরদেহ উদ্ধারের সময় স্থানীয় বাসিন্দা ও সংবাদকর্মীদের কারখানার ভেতরে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এই বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জয়দেবপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) নয়ন কুমার কর জানান, ঘটনার খবর পেয়ে জয়দেবপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে আইনি প্রক্রিয়া মেনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এদিকে ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। গাজীপুর জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হায়দার আলী জানান, “বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে ধারাবাহিক মানসিক নির্যাতন, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা অতিরিক্ত চাপে রেখে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হলে তা ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনা’ হিসেবে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।”

নিহতের ভাই নূরে আলম জানিয়েছেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের সাথে বসার প্রস্তাব দিয়েছে। আলোচনার পরেই পরিবার পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

জাকারিয়ার এই মর্মান্তিক মৃত্যু দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও কর্মপরিবেশের বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। শ্রমিক অধিকারকর্মীদের মতে, উৎসবের সময়েও ছুটি না পাওয়া, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা এবং কর্তৃপক্ষের মানসিক চাপ এই খাতের একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। শ্রমিকদের মানবিক কর্মপরিবেশ ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে কারখানাগুলো কতটা দায়িত্বশীল, জাকারিয়ার মৃত্যু সেই প্রশ্নই পুনরুত্থাপন করেছে।

ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং পুলিশের আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষেই জানা যাবে জাকারিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ। তবে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার, সহকর্মী ও স্থানীয় সচেতন মহল।

 

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

Comments are closed.

এই বিভাগের আরও খবর