মনোয়ার হোসেন রনি : বাংলাদেশের ক্রীড়াইতিহাসের এক উজ্জ্বল ও অনন্য নক্ষত্র রামা লুসাই। পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী লুসাই পরিবার মূলত হকির জন্য ক্রীড়ামোদীদের কাছে পরিচিত হলেও রামা লুসাই ছিলেন ব্যতিক্রমী এক প্রতিভা—যিনি একাধারে ফুটবল ও হকি—দুই খেলার মাঠেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সেরা হিসেবে।
১৯৮০ সালে তিনি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ফুটবল দলের অধিনায়ক নির্বাচিত হন এবং সেই বছরই তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে মোহামেডান লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ১৭ নম্বর জার্সি পরে মাঝমাঠে খেলা এই ফুটবলার বল নিয়ন্ত্রণ, গতি, চমৎকার ড্রিবলিং এবং পুরো মাঠ চষে বেড়ানোর ক্ষমতার জন্য সমর্থকদের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। মাঝমাঠ থেকে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ চিরে তাঁর বল নিয়ে ছুটে যাওয়ার দৃশ্য আজও আশির দশকের ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অম্লান( তখন আমরা ছোট)
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য—রামা লুসাই একই দিনে মোহামেডানের হয়ে হকি ও ফুটবল, দুটি খেলাতেই মাঠে নেমেছেন। বিকেলে ঢাকা স্টেডিয়ামের টারফে হকি খেলে, সন্ধ্যায় আবার সেই একই শক্তিতে বুট পায়ে ফুটবলে প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর এমন শারীরিক সক্ষমতা, পেশাদারিত্ব ও প্রতিভার উদাহরণ বিশ্ব ক্রীড়াজগতেই বিরল।
বাংলাদেশের হকি অংঙ্গনে ‘লুসাই পরিবার’ এক স্বর্ণালী অধ্যায়। রামা লুসাইয়ের ভাইদের মধ্যে জুম্মন লুসাই (বাংলাদেশের হকির অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার ও প্রথম অল-এশিয়ান একাদশের খেলোয়াড়), ডনডন লুসাই এবং জোবেল লুসাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। পরবর্তী প্রজন্মে ডনডনের ছেলে বিয়াকা লুসাই-ও মেরিনার্সসহ শীর্ষ ক্লাবগুলোর হয়ে হকিতে দ্যুতি ছড়িয়েছেন।
আজকের পেশাদার ক্রীড়াবিশ্বে যখন একজন খেলোয়াড়কে একটি খেলায় টিকে থাকতেই হিমশিম খেতে হয়, তখন রামা লুসাই ছিলেন এমন এক যুগের প্রতীক—যখন প্রতিভা, মেধা ও নিষ্ঠা দিয়ে একাধিক খেলায় জাতীয় ও ক্লাব পর্যায়ে সর্বোচ্চ গৌরব অর্জন করা যেত। তাঁর ছোট ভাই জুম্মন লুসাই সহ পরিবারের কয়েকজন কৃতী খেলোয়াড় ইতোমধ্যে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন।
মাঠের মাঝমাঠে যিনি ছিলেন পাহাড়ের মতো অটল, তিনি আজও বাংলাদেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের হৃদয়ে আশাকরি জীবন্ত,যদি উনাকে আমরা মনে রাখার চেষ্টা করি।
উল্লেখ্য: আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে ফুটবল ও ক্রিকেট বা অন্য দুটি খেলায় একাধিক দেশের জাতীয় দলের হয়ে খেলার নজির অল্প কিছু রয়েছে। যেমন—স্যার ভিভ রিচার্ডস ফুটবলে অ্যান্টিগার হয়ে ফিফা বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব খেলেছেন এবং ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিশ্বকাপ জিতেছেন। এলিস পেরি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ফুটবল ও ক্রিকেট দুটো খেলারই বিশ্বকাপ খেলেছেন। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একই সাথে ফুটবল ও হকির মতো দুটি শীর্ষ জাতীয় দলে ও একই দিনে দুই ক্লাবের খেলায় রামালুসাইয়ের এই আধিপত্য একেবারেই বিরল ও অবিস্মরণীয়।
যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ ও উদাত্ত আহ্বান: রামা লুসাইয়ের মতো বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ক্রীড়াবিদ যেকোনো দেশের জন্যই এক গর্বের বিষয়। তিনি বেঁচে থাকতেই যেন তাঁর ক্রীড়ানৈপুণ্য ও অবদানের সঠিক মূল্যায়ন করা হয়।
জাতীয় সম্মাননা: বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ ক্রীড়া পুরস্কার (জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার) বা কোনো জাতীয় সম্মানে ভূষিত করা হোক।
সংবর্ধনা ও তথ্য সংরক্ষণ: বাফুফে (BFF) ও বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন (BHF)-এর যৌথ উদ্যোগে এই কিংবদন্তিকে সম্মানিত করা এবং তাঁর জীবনের গৌরবময় তথ্য জাতীয় ক্রীড়া আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হোক।
আসুন, আমাদের এই জীবন্ত কিংবদন্তিকে তিনি বেঁচে থাকতেই তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও ভালোবাসায় সিক্ত করি।
তথ্য, খবর নিয়ে যতটুকু জেনেছি রামা লুসাই বর্তমানে বার্ধক্যজনিত কারণে ভারতের মিজোরামে অবসর জীবনযাপন করছেন।