গাজীপুর প্রতিনিধি: গাজীপুরে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) খতিয়ানভুক্ত সরকারি জমি দখলের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন দৈনিক নয়া দিগন্ত-এর জয়দেবপুর প্রতিনিধি আব্দুল আজিজ। এ ঘটনায় চিকিৎসা শেষে গত শনিবার (২৭ জুন) রাতে জয়দেবপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন ওই সাংবাদিক। মামলায় স্থানীয় যুবদল নেতা আরাফাত রহমান রাসেলকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এছাড়া তার সহযোগী আরও ৮-১০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
জয়দেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন জানান, মামলাটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান চলছে।
এদিকে, সাংবাদিকের ওপর হামলার এই ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মামলা দায়েরের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ এবং বিভিন্ন সূত্রে যুবদল নেতা রাসেলের বিরুদ্ধে বনভূমি দখল, অবৈধ বসতি স্থাপন, চাঁদাবাজি ও মাদক চক্র নিয়ন্ত্রণের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বারুইপাড়া বিটের বারুইপাড়া মৌজার এসএ ১৭১১ ও আরএস ৩৭৪৯ নম্বর দাগের প্রায় ছয় একর সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে সেখানে ‘খাসপাড়া’ নামে একটি অবৈধ বসতি গড়ে তুলেছেন রাসেল। অভিযোগ রয়েছে, এই বসতিতে বিভিন্ন অপরাধ চক্রের সদস্যদের পুনর্বাসন করা হয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত মাদক ও জুয়ার আসর বসে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাসেলের সহযোগীরা বারুইপাড়া মৌজার আরএস ৪২৯৮ নম্বর দাগের প্রায় ১২৫ শতাংশ জমিতে অবৈধভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে। সেখান থেকে প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের টাকা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। একইভাবে, রাজেন্দ্রপুর পশ্চিম বিটের আওতায় আল-আকসা মসজিদ সংলগ্ন সংরক্ষিত বনভূমির বিভিন্ন অংশ দখল করে ঘর নির্মাণের সুযোগ করে দেওয়ার নামে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে ঘর বা ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও বন বিভাগের ডিমারকেশন (সীমানা নির্ধারণ) জটিলতাকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে রাসেলের বিরুদ্ধে।
এলাকাবাসীর দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাসেলের প্রভাব আরও বেড়ে যায়। এই সময়কালে বিভিন্ন সেক্টরে প্রভাব খাটিয়ে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জন করেন, যা বর্তমানে এলাকায় মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
রাসেলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে এলাকায় রয়েছে নানা গুঞ্জন। স্থানীয়দের দাবি, তিনি একসময় জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তবে পটপরিবর্তনের পর খোলস বদলে বর্তমানে তিনি ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। বন বিভাগের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, বনের জমি জবরদখলের কারণে অতীতেও রাসেলের বিরুদ্ধে বন আইনে একাধিক মামলা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বারুইপাড়া ও রাজেন্দ্রপুর পশ্চিম বিটের কিছু অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরোক্ষ যোগসাজশেই দীর্ঘদিন ধরে এই বনভূমি দখল, অবৈধ ঘর নির্মাণ এবং কোটি কোটি টাকার লেনদেনের চক্রটি সক্রিয় রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত আরাফাত রহমান রাসেলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকের ওপর বর্বরোচিত হামলা এবং সরকারি জমি ও বনভূমি দখলের এই মহোৎসবের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। তারা অবিলম্বে মূল হোতা রাসেলসহ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।