গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহি হাতে ভাজা মুড়ি শিল্পে বিপর্যয়

মোঃ হাজিনুর রহমান শাহীন : পবিত্র রমজান মাসে সারাদিন রোজা রেখে যখন ইফতারের সময় হয়, তখন মুড়ির গুরুত্ব হয়ে উঠে অপরিসীম। মুড়ি ছাড়া যেন বাঙালীদের ইফতার কল্পনাই করা যায় না। গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী হাতে ভাজা মুড়ি, যা রমজানের অন্যতম অনুষঙ্গ,যার স্বাদে রয়েছে ভিন্নমাত্রা। মচমচে মুড়ির সাথে ছোলাবুট-পেঁয়াজু, চিনি বা আখের গুড় মিশিয়ে ইফতারের সময় স্বাদ উপভোগ করার আনন্দই আলাদা। কিন্ত কালের বিবর্তনে আর আধুনিকতা ও নগর সভ্যতার সংস্পর্শে সেই হাতে ভাজা মুড়ির সুবাস ও স্বাদ যেন হারিয়ে যাচ্ছে। গ্রামীণ এই খাবার যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল, আজ তা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

আধুনিক যুগে মেশিনের তৈরী সস্তা ও চকচকে মুড়ি প্যাকেট আকারে বা খোলা অবস্থায় বাজারে সয়লাব হবার কারনে হাতে ভাজা মুড়ি শিল্প পরেছে বিপদে। যে হাতে ভাজা মুড়ি একসময় গাজীপুরের প্রতিটি বাড়ীতে রমজান ছাড়াও উৎসব পার্বনে তৈরী করা হতো, তা এখন শুধুমাত্র হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার জীবিকার তাগিদে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্ত মেশিনের সাথে প্রতিযোগিতায় না পেরে এবং পরিশ্রম অনুযায়ী উপযুক্ত সম্মানী না পাবার কারনে এ শিল্প রয়েছে এখন মহাসংকটে। কঠোর পরিশ্রমের এ কাজ ছেড়ে কারিগররা ছুটছেন ভিন্ন পেশায়। তবে চেষ্টা করলে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কারিগরদেরকে সঠিক মূল্যায়ন করলে এখনো এ শিল্পকে বাচিয়ে রাখা যেতে পারে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের।

জানা গেছে, একসময় গাজীপুরের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই হাতে মুড়ি ভাজার শব্দ শোনা যেত। কিন্ত সময়ের সাথে সাথে এখন আর সেই ঐতিহ্য নেই । তবে জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার কয়েকটি দরিদ্র পরিবার নিজেদের জীবিকার তাগিদে পেশা হিসেবে মুড়ি ভাজাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গ্রামীণ সেই হারানো ঐতিহ্যকে এখনো টিকিয়ে রেখেছেন। উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের খলিশাজানি গ্রামে গিয়ে মুড়ি ভাজার সেই গ্রামীণ চিত্র দেখা গিয়েছে।
হাতে তৈরী মুড়ি ভাজার শ্রমিক, কারিগর ও ব্যবসায়িদের সাথে কথা বলে জানা গেছে এ শিল্পের আভ্যন্তরিন নানা সংকটের কথা । তারা জানান, আজ থেকে প্রাায় ২৮/৩০ বছর আগে এ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের শতাধিক দরিদ্র পরিবার ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নিয়ে এ শিল্পের সাথে জড়িয়ে পরে। কিন্ত বর্তমানে মাত্র ১০ থেকে ১৫ টি পরিবার কোনমতে এ শিল্পে টিকে রয়েছে। তাদের আশংকা , হয়তো আগামী বছর থেকে তাদেরকেও আর পাওয়া যাবে না এ কাজে।
সরেজমিনে খলিশাজানি গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, মোঃ হাবিল মিয়ার বাড়ীর উঠানের এক পাশে ছোট একটি পাতার ছাওনীর দুচালা ঘরে কয়েকজন কারিগর ও শ্রমিক মুড়ি ভাজায় ব্যস্ত রয়েছেন। পাশাপাশি দুইটি চুলায় দুইটি মাটির হাড়িতে দুজন মধ্যবয়সী মহিলা চাল গরম করছেন এবং পাটের শলাকা দিয়ে অনবরত নাড়ছেন। চুলায় আগুন ধরিয়েছেন লাকরীর পরিবর্তে কুড়ানো ঝরা পাতা দিয়ে। অন্য দুজন কারিগর চাল ভাজার উপযুক্ত হলে ঢেলে দিচ্ছেন উত্তপ্ত বালির ঝাঝরে। মুহুর্তেই চাল থেকে মুড়ি হয়ে যাচ্ছে এবং আরেকজন তা একটি মাটির চালনীতে ঢেলে বালি এবং মুড়ি আলাদা করছেন। আবার কয়েকজন মিলে মুড়িগুলি বড় বড় বস্তায় ভরে সাজিয়ে রাখছেন। উঠানে ধান শুকাচ্ছেন কয়েকজন আবার সে ধান পাশেই সিদ্ধ করে আবার শুকিয়ে মুড়ির চালের উপযুক্ত করছেন। প্রচন্ড গরমে ঘর্মাক্ত শরীরে কঠোর পরিশ্রম করছেন সবাই।
কথা হয় মোঃ হাবিল মিয়ার সাথে। তিনি জানান, ২০ বছর যাবত তিনি এ পেশার সাথে আছেন। তার মত এ গ্রামে আরো ১২ থেকে ১৫টি পরিবার এ পেশার সাথে রয়েছেন। হাবিল মিয়াসহ তাদের কারোরই নিজস্ব কোন জায়গা জমি বা মাথা গোজার ঠাই নেই। সরকারী খাস জায়গায় ঘরবাড়ি বানিয়ে বসবাস করেন তারা। রমজানে মুড়ি তৈরীর চাহিদা থাকলেও সারা বছর এ পেশায় থাকতে পারেন না। তখন অন্য কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।
তিনি জানান, তারা শুধু মুড়ি ভাজার কাজ করেন। মুড়ির ব্যবসা করেন মহাজনরা। এখানে ৪/৫ জন বড় মহাজন রয়েছেন, যারা তাদের কাছে ধান দিয়ে যায়। ধান শুকানো , সিদ্ধ করা, আবার শুকানো, মুড়ি ভাজা ও বড় বড় বস্তায় ভরে দেওয়া তাদের কাজ। তিনি জানান, মহাজনরা একসাথে ১২ থেকে ১৪ মন ধান দিয়ে যান। এগুলি মুড়ি তৈরী করতে আমাদেরকে পারিশ্রমিক হিসেবে প্রতি মনে ৫শ থেকে ৭শ টাকা দিয়ে থাকেন। সবকিছু রেডি করার পর তারা মুড়ির বস্তা স্থানীয় বহেড়াতলী বাজারের পাশের গোডাউনে নিয়ে রাখেন। সেখান থেকে ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করা হয়।
মুড়ি কারিগর বাছিরন এ প্রতিবেদককে জানান, বাজারে সব জিনিসপত্রের দাম বেশী।সারাদিন আগুনে পুড়ে কঠোর পরিশ্রম করে মুড়ি ভেজে যে টাকা পাই, তা দিয়ে সংসার চলে না। তারপরও অনেক বছর ধরে এ কাজ করছি, তাই ছাড়তেও পারছি না।
জাহানারা বেগম ও হাবিরন নামে অন্য দুই কারিগর বলেন, নিজেদেও জায়গা জমি নেই। খাস জমিতে বাড়ী বানিয়ে থাকি, কখন সরকারী লোকজন এসে আমাদেরকে উঠিয়ে দেয়, সে ভয়ে থাকি। সরকার যদি আমাদের দিকে একটু নজর দিত, তাহলে আমরা ভালভাবে বাচঁতে পারতাম।
বহেড়াতলী বাজারের উত্তর পাশে মৌচাক-ফুলবাড়িয়া সড়কের পাশে বিশাল বড় দুইটি মুড়ির গোডাুন রয়েছে। কারিগররা মুড়ি ভাজার পর এখানেই এনে রাখা হয়। পরে সেখান থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় মুড়ির বস্তা সরবরাহ করা হয়। এখানে কথা হয়, প্রায় ২৮ বছর যাবত এ ব্যবসার সাথে জড়িত মোঃ আলাল মিয়ার সাথে। তিনি জানান, আগের তুলনায় হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা কমে গেছে। এখন মেশিনের মুড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে আমরা পারছি না। কারন মেশিনের তৈরী মুড়ি দেখতে সুন্দর, দামে সস্তা। তারা মুড়ির রং সাদা করার জন্য ইউরিয়া সার মুড়ির সাথে মিশিয়ে থাকে। ফলে কাস্টমার সহজেই আকৃস্ট হয়। পাশাপাশি আমাদের মুড়ির রং একটু গাড় হয়, দাম বেশী থাকার কারনে সবাই মেশিনের তৈরী মুড়ি কিনে। তিনি জানান, আগে যা লাভ হতো, এখন তার অর্ধেকও হয় না।
আব্দুল হক নামে অরেক মহাজন জানান, সব ধরনের ধান দিয়ে মুড়ি তৈরী করা যায় না। এ জন্য নাটোর থেকে একধরনের চিকন ধান কিনে আনতে হয়। আর মোটা মুড়ি তৈরী করতে বরিশাল থেকে মোতা নামের এক ধরনের ধান কিনে আনতে হয়। বর্তমানে ধান কিনে এনে মুড়ি তৈরী ও বাজারজাত করে খুব বেশী লাভ থাকে না। তিনি আরো জানান, এ পেশার কারিগররা উপযুক্ত সম্মানী না পেয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে মুড়ি তৈরীর লোক পাওয়া যাবে না। এতে অচিরেই এ শিল্পটি হারিয়ে যাবার শংকা রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা উৎপল রক্ষিত জানান, গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী হাতে ভাজা মুড়ি শিল্প আজ মেশিনের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এক সময় এই মুড়ি ছিল স্থানীয় মানুষের পছন্দের একটি প্রধান খাদ্য, কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির হাত ধরে মেশিনে তৈরি মুড়ির আগমন ও তার সঙ্গে কম দামে ব্যাপক উৎপাদন শুরুর ফলে হাতে ভাজা মুড়ির এই শিল্প টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, গাজীপুর জেলার বিভিন্ন গ্রামে শত শত বছর ধরে প্রচলিত এই শিল্প ছিল এলাকার মানুষের জীবন জীবিকার প্রধান উৎস। মেশিনে তৈরি মুড়ির তুলনায় হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদ ও মান অনেক ভালো, তবে বর্তমান বাজারে মেশিনের তৈরি মুড়ি অধিক সস্তা হওয়ায় ক্রেতাদের হাতে ভাজা মুড়ির প্রতি আগ্রহ কমে গেছে। এর ফলে, হাতে ভাজা মুড়ি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অনেক পরিবার আজ দুর্দিনের সম্মুখীন। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচাতে প্রয়োজন সরকারি সাহায্য ও সচেতনতা বৃদ্ধি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে মেশিনে তৈরি মুড়ি খেতে গিয়ে এক নতুন ধরনের বিপদ দেখা দিচ্ছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে মেশিনের মুড়িতে ক্ষতিকর ইউরিয়া সার মিশিয়ে চকচকে সাদা রঙের মুড়ি তৈরি করছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
গাজীপুরের শহীদ তাজ উদ্দিন আহমেদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু সার্জারী বিশেষজ্ঞ ডা: শংকর কুমার জানান, ইউরিয়া একটি রাসায়নিক সার, এটি মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই সার দীর্ঘ মেয়াদে মানবদেহে প্রবেশ করলে কিডনি ও লিভার সমস্যা, গ্যাস্ট্রিক, এবং বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে। চকচকে সাদা রঙের মুড়ির দিকে মানুষের আগ্রহ বাড়লেও তা বর্তমানে এক বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই ধরনের মুড়ি খাওয়ার প্রবণতা বেশি থাকায় তাদের স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে এবং এই ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, যাতে সবাই এই ধরনের ক্ষতিকর পণ্যের বিপদ সম্পর্কে জানে ।
গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী হাতে ভাজা মুড়ি শিল্প বর্তমানে এক কঠিন সংকটের মুখে। দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্পের সাথে জড়িত কারিগররা তাদের কঠোর পরিশ্রমের সঠিক মূল্য না পেয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রতিদিন দীর্ঘ ঘণ্টা কাজ করার পরও আয় না বাড়ায় বেশিরভাগ কারিগর তাদের পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এর ফলে, মুড়ি শিল্পে অভিজ্ঞ কারিগরের অভাব দেখা দিয়েছে।
শ্রমের সঠিক মূল্য না পাওয়ার কারণে, কারিগররা হতাশ হয়ে পড়ছেন এবং তাদের দক্ষতা ও পরিশ্রমের সঠিক স্বীকৃতি না মেলায় অনেকেই কাজ ছাড়ছেন। ব্যবসায়ীদের পক্ষে মেশিনের সাহায্যে সস্তায় মুড়ি উৎপাদন করা সম্ভব হলেও, হাতে ভাজা মুড়ির মান ও স্বাদ মেশিনে তৈরি মুড়ির তুলনায় অনেক ভালো। এই সংকট কাটাতে যদি যথাযথ সরকারী সহায়তা ও ন্যায্য মজুরি প্রদান না করা হয়, তবে গাজীপুরের মুড়ি শিল্প খুব শিগগিরই হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।