এক সার্ভিস উদ্বোধনে ছয় উপদেষ্টা

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের উপকূলীয় নৌপথে প্রথমবারের মতো চালু হলো ফেরি সার্ভিস। চট্টগ্রামের বাঁশবাড়িয়া থেকে সন্দ্বীপ পর্যন্ত এ ফেরি সার্ভিস গতকাল উদ্বোধন করেন নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। সঙ্গে ছিলেন আরো পাঁচ উপদেষ্টা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা বীর প্রতীক ফারুক-ই-আজম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। প্রধান উপদেষ্টার দুই বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরী ও অধ্যাপক সায়েদুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। ফেরি সার্ভিসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন না।

ঘটা করে উদ্বোধন হলেও ফেরি সার্ভিস চলতে পারে কেবল সাতদিন। কেননা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাঁশবাড়িয়া-সন্দ্বীপ রুটে সার্ভিসে যুক্ত হওয়া ফেরি কপোতাক্ষ উপকূলীয় এলাকায় চলাচলের উপযোগী নয়। অন্যদিকে মার্চের পর সাধারণত সন্দ্বীপ চ্যানেল অশান্ত হয়ে ওঠে। এ কারণে আগামী এপ্রিল থেকে হয়তো সার্ভিসটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে সার্ভিস বন্ধ হলেও বিআইডব্লিউটিসি উপকূলীয় এলাকায় চলাচল উপযোগী একটি ফেরির নির্মাণকাজ শুরু করেছে। আগামী বছর থেকে এ সমস্যা আর থাকবে না।

উদ্বোধনের দিন থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত এ রুটে ফেরি চলাচলের একটি সময়সূচি প্রকাশ করেছে বিআইডব্লিউটিএ। সময়সূচি অনুযায়ী, উদ্বোধনের প্রথম তিনদিন উভয় দিকে দুবার করে ফেরি চলাচল করবে। এর পর থেকে ফেরি চলবে দিনে একবার করে। জোয়ার-ভাটার সময় অনুযায়ী ফেরি ছাড়ার সময়ও পরিবর্তন হবে। আপাতত ৩১ মার্চ পর্যন্ত এ সময়সূচি দেয়া হয়েছে। এরপর আবহাওয়া ভালো থাকা সাপেক্ষে ফেরি চালানো কিংবা বর্ষাকালীন পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান।

সীতাকুণ্ডর বাঁশবাড়িয়া ঘাটে গতকাল সকালে ফেরি সার্ভিস উদ্বোধনের পর উপদেষ্টারা ফেরিতে করেই সন্দ্বীপে যান। সেখানে অনুষ্ঠিত এক সুধী সমাবেশে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন,‘সন্দ্বীপের যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল মধ্যযুগীয়। চট্টগ্রামের সন্নিকটের একটি দ্বীপ হলেও ঐতিহাসিক স্থান ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এ দ্বীপের বাসিন্দাদের নিজ বাড়িতে যেতে কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়তে হতো। ফেরি সার্ভিস চালুর মাধ্যমে আমরা একটা দীর্ঘ লজ্জা থেকে বাঁচলাম।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সন্দ্বীপের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশু, অসুস্থ ও প্রবীণ মানুষের জন্য যাতায়াত ছিল খুবই কঠিন। এখন থেকে সবাই সপরিবারে যাতায়াতের সুযোগ পাবে। সন্দ্বীপের মানুষ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ-আমেরিকা থেকে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। নতুন এ যাতায়াত ব্যবস্থার উদ্যোগ প্রবাসীদের অবদানের তুলনায় খুবই সামান্য।’

বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদ সন্দ্বীপসহ উপকূলীয় ও দুর্গম এলাকাগুলোয় সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান স্বাচ্ছদ্যময় করার চেষ্টা করবে বলে এ সময় আশাবাদ ব্যক্ত করেন ড. ইউনূস।

বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাঁশবাড়িয়া-সন্দ্বীপ রুটে ফেরি সার্ভিস চালুর একটি উদ্যোগ কয়েক বছর ধরে চলমান ছিল। সেখানকার বাসিন্দা উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান আবার উদ্যোগী হয়ে ফেরিঘাট নির্মাণ কার্যক্রম হাতে নেন। তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল ফেরি সার্ভিসটি উদ্বোধন হলো।

এর আগে ফেরি সার্ভিস উদ্বোধনের জন্য ৫ মার্চ নির্ধারিত ছিল। তবে তার আগে প্রবল জোয়ারে পন্টুনের সংযোগ কাঠামো ভেঙে যাওয়ায় উদ্বোধন পিছিয়ে দেয়া হয়। এ ফেরিতে এক টন পর্যন্ত পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩০০ টাকা। একইভাবে তিন টন পর্যন্ত পণ্যবাহী যানবাহন (ছোট ট্রাক, লরি ও কাভার্ড ভ্যান) ১ হাজার ৫০০ টাকা; তিন থেকে পাঁচ টন পণ্যবাহী ট্রাক, ট্যাংক লরি ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ১ হাজার ৬০০; পাঁচ থেকে আট টন পর্যন্ত পণ্যবাহী গাড়ি ২ হাজার; ৮ থেকে ১১ টনের পণ্যবাহী গাড়ি ২ হাজার ৭০০; ১০ চাকাবিশিষ্ট সাধারণ পণ্যবাহী যানবাহন (গ্যাস, বিস্ফোরক দ্রব্যবাহিত ও নন-স্ট্যান্ডার্ড যানবাহন ছাড়া) ৫ হাজার ৭০০; তিন থেকে আট টন পণ্যবাহী কিন্তু আকারে বড় বাস কিংবা কোচের সমান হলে ২ হাজার ৭০০; মিনিবাস ১ হাজার ৭৫০; মাঝারি আকারের বাস ২ হাজার ৪৫০; বড় বাস ২ হাজার ৬৫০; মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স, বড় টেম্পো ও হিউম্যান হলারজাতীয় যানবাহন ১ হাজার ৪০০; স্টেশন ওয়াগন, ল্যান্ডক্রুজার, স্কাউটজাতীয় গাড়ি, বড় জিপ, প্রাডো, নিশান, পাজেরো ও পেট্রলচালিত লাক্সারি জিপজাতীয় যানবাহন ১ হাজার ৩০০; ব্যক্তিগত কার ও টেম্পো ৭৫০; মোটরসাইকেল ১৫০; সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান ও রিকশার ভাড়া ৪০০; বাইসাইকেল ৭৫; ডিলাক্স শ্রেণীর যাত্রী জনপ্রতি ১০০ ও সুলভ শ্রেণীর যাত্রী জনপ্রতি ৮০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।